#বৈজনাথ মন্দিরকলমে - Shiuli Sen
![]() |
Shiuli Sen |
হিমাচল প্রদেশ এ দ্বাদশ জ্যোতিলিঙ্গ একমাত্র জ্যোতিলিঙ্গ হলো বৈজনাথ। কাংড়া উপত্যকার শেষ প্রান্তে ১৩৬০ মিটার উচ্চে ছোট শহর বৈজনাথ।যোগীন্দর নগর থেকে ধর্মশালার পথে যেতে পারে বৈজনাথ মন্দির। যোগীন্দরনগর থেকে ২২ কিলোমিটার এবং পালমপুর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে ছোট শহর বৈজনাথ। মন্দিরের নামে জায়গার নাম বৈজনাথ।
পুরাণে কথিত আছে‚ এই মন্দিরের শিবলিঙ্গ নাকি রাবণের সঙ্গে জড়িত। বলা হয়, রাবণ কৈলাস পর্বতে তপস্যা করার সময় মহাদেবের উদ্দেশে তাঁর দশটি মাথাই উত্সর্গ করেন। সন্তুষ্ট শিব আবার তাঁকে ফিরিয়ে দেন দশানন। রাবণ শিবকে নিয়ে যেতে চান লঙ্কায়। শিব বলেন‚ রাবণ তা পারবেন। কিন্তু তিনি যে শিবলিঙ্গের রূপ ধারণ করবেন সেটিকে একবারও মাটিতে নামানো যাবে না। সেই শর্তে রাবণ নিয়ে যান মহাদেবকে। পথে হিমাচলের বৈজনাথে এসে তিনি বাধ্য হন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। সামনেই এক রাখাল বালককে দেখে তাকে ধরতে দেন শিবলিঙ্গ। কিন্তু ওই ভার সহ্য করতে না পেরে সে তা মাটি নামিয়ে ফেলে। অনেকের মতে, ওই রাখাল আসলে ছিল গণেশের এক রূপ। এভাবেই দেবতারা ছল করে মহাদেবের লঙ্কায় যাওয়া আটকে দেন। সেই থেকে মহাদেব বৈজনাথে অধিষ্ঠিত। তিনি পূজিত হন অর্ধনারীশ্বর রূপে। তবে ঐতিহাসিক তথ্য বলে‚ এই মন্দির নির্মিত হয়েছিল ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে শক শাসকদের আমলে।
আটশো বছরের প্রাচীন এই মন্দিরে দুটি শিলালিপি আছে | যা পরিচিত ‘ বৈজনাথ প্রশস্তি ‘ বলে | সেখান থেকে জানা যায়‚ দুই ধনী ব্যবসায়ী ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন | আহুকা ও মন্যুকা নামে দুই ব্যবসায়ী ছিলেন পরম শিবভক্ত | শিলালিপি থেকে আরও জানা যায়‚ মন্যুকার পিতার নাম সিদ্ধা | তাঁর মায়ের নাম চিন্না | মণ্যুকার ভাই আহুকা | আহুকার স্ত্রী গুলহা প্রকৃতই গৃহলক্ষ্মী |
সারদা ও তকড়ি হরফে রচিত হয়েছিল বৈজনাথ প্রশস্তি | ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর অংশে প্রচলিত ছিল সারদা ভাষা | এর থেকেই বিবর্তিত হয়েছিল আজকের গুরুমুখি ভাষা | তকড়িও প্রাচীন মধ্যযুগীয় হরফ | ১৯৪০ সাল অবধি এই হরফেই লেখা হতো ডোগরি ভাষা | পরে সে স্থান গ্রহণ করে দেবনাগরী | কাংড়ার কাতোচ বংশীয় রাজা সংসারচাঁদ এই মন্দিরের প্রভূত সংস্কার সাধন করেছিলেন | সে তথ্যও জানা যায় দেবালয়ের শিলালিপি থেকে |
নাগাড়া ঘরানায় তৈরি এই মন্দির এক বিস্ময় | মন্দিরের শিখর আশি ফিট উঁচু | কেউ বলেন‚ সেখানে ফুল লতাপাতার কারুকাজ করা আছে | আবার কোনও বিশেষজ্ঞ বলেন‚ সেখানে আছে কোনও দুর্বোধ্য লিপি‚ যার পাঠোদ্ধার এখনও সম্ভব হয়নি | গণেশ ও হনুমান-সহ অন্য হিন্দু দেবদেবীদের মূর্তি মন্দিরে খোদিত | পাশাপাশি আছে রামচন্দ্র ও সীতার বিবাহদৃশ্য |
শৈব মন্দির হিসেবে এখানে নন্দীর বিগ্রহও আছে | প্রাচীন এই মন্দিরের গায়ে প্রাচীন শ্লোক খোদাই করা আছে | আর্কিওলজিক্যাল সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া দ্বারা সংরক্ষিত এই দেবালয় মধ্যযুগীয় হিমাচলি স্থাপত্যের রত্নসম উজ্জ্বল নিদর্শন |
বৈদ্যনাথ অর্থাৎ চিকিৎসক রূপী শিব। বৈদ্যনাথ থেকে নামান্তর ঘটেছে বৈজনাথ। ভারতের হিমাচল প্রদেশের কাংড়া উপত্যকায় অবস্থিত বৈজনাথ মন্দির একটি প্রাচীন শিব মন্দির। ভূপ্রাকৃতিকভাবে ভূমিকম্পপ্রবণ হিমাচল প্রদেশের এই মন্দিরটি অনেকবার তীব্র ভূমিকম্পের আঘাতের সন্মূখীন হয়েছে। তবু মন্দিরটি আজও কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বৈজনাথ মন্দিরের (Baijnath Temple) অপূর্ব কারুকাজ আজও পর্যটক ও পূণ্যার্থীদের আকর্ষণ করে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এই মন্দিরকে চিকিৎসকদের মন্দির বলে আখ্যায়িত করা হয়। এই মন্দির চত্বর থেকে দেখা যায় তুষারধবল ধৌলাধার। সামনে আশাপুরী রেঞ্জ। নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে বিনোয়া নদী।শিবরাত্রি তে এখানে জমকালো উৎসব হয়।
শৈব মন্দির হিসেবে এখানে নন্দীর বিগ্রহও আছে | প্রাচীন এই মন্দিরের গায়ে প্রাচীন শ্লোক খোদাই করা আছে | আর্কিওলজিক্যাল সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া দ্বারা সংরক্ষিত এই দেবালয় মধ্যযুগীয় হিমাচলি স্থাপত্যের রত্নসম উজ্জ্বল নিদর্শন |
শোনা যায় ১৮৭৯ সালের ব্রিটিশ রাজত্বের সময়ে ভারতে লেফ্টেন্যান্ট কর্নেল মার্টিন অগরমালওয়া এলাকায় কর্মসূত্রে নিয়োজিত ছিলেন।এইসময়ে সীমান্তবর্তি প্রদেশে ব্রিটীশদের সঙ্গে আফগানদের যুদ্ধ শুরু হলে কর্নেল মার্টিনকে যুদ্ধে যোগ দিতে হয়। তিনি যুদ্ধে গেলেও অগর মালওয়ায় তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাঁর জীবিত থাকার খবর নিযমিত চিঠির মাধ্যমে চলতে থাকে।কয়েক মাস পরে এই চিঠি আসা বন্ধ হয়ে যায় তখন মার্টিনের স্ত্রী তাঁর সঙ্গ কোনো যোগাযোগ করতে না পারায় স্বামীর বিষয়ে খারাপ চিন্তা করতে থাকেন। এতে তাঁর স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকে।
একদিন বৈজনাথ মন্দিরের পাশ দিয়ে যাবার সময় ব্রাহ্মনদের মন্ত্র উচ্চারন শুনে সেখানে যান। তাঁর সমস্যা শোনার পর ব্রাহ্মনরা বলেন ভগবান শিবকে প্রার্থনা করলে তিনি তাঁর ভক্তদের দু:খ লাঘব করেন।সঙ্গে ১১ দিন নম: শিবায় মন্ত্রে শিবের প্রার্থনা করার উপদেশ দিলেন।স্বামী ফিরে এলে মন্দিরের সংস্কার করবেন কথা দিয়ে প্রার্থনা শুরু করেন ও ১১ দিনের মাথায় স্বামীর চিঠিতে ব্রিটীশের যুদ্ধ জয়ের কথা জানতে পারেন।
মার্টিনের স্ত্রী কে লেখা চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন যে আফগানদের হাতে বন্দী হবার পর বাঘ ছাল পরা এক যোগী ত্রিশূল হাতে এসে তাঁকে রক্ষা করেন ও আফগান দের পিছু হটতে বাধ্য করেন। তাঁর স্ত্রীর প্রার্থনা ও ত্যাগের কারনে যোগী তাঁকে রক্ষা করতে এসেছেন বলে জানান।
১৮৮৩ সালে জন্মসূত্রে হিন্দু না হওযা ঐ ব্রিটীশ দম্পতি বৈজনাথ মন্দির সংস্কারে এগিয়ে আসেন এবং ১৫,০০০ টাকার অর্থ সাহায্য করেন।
বৈজনাথ বাস স্ট্যান্ডে নেমে বড় রাস্তা থেকে কয়েক ধাপ নীচে নামলেই মন্দির।বড় রাস্তা থেকে ধাপে ধাপে নেমে মন্দিরের দরজায় পৌঁছে যাওয়া যায়।দরজার পাশে গঙ্গা যমুনা লক্ষ্মী, বিষ্ণু, সূর্য, চামুন্ডা, কার্তিকেয় ,নন্দী ছাড়াও নানান দেব দেবীর মূর্তি।মন্দিরের সামনে একটি মন্ডপ।মন্দিরের শিরে চূড়া দিয়ে গঠনশৈলীর কারনে এর সাথে উড়িষ্যার মন্দিরশৈলীর মিল পাওয়া যায়। এই চত্বরে ছোট ছোট আরো ষোলটি মন্দির আছে।



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন